টাঙ্গাইল জেলার দর্শনীয় স্থান গুলো কি কি? প্রতিটি স্থানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা

লৌহজং নদী তীরে অবস্থিত টাঙ্গাইল শহরটি ঢাকা বিভাগের অন্যতম প্রধান একটি জেলা শহর। টাঙ্গাইলের অবস্থান ঢাকা থেকে উত্তর-পশ্চিমে ৮২ কিলোমিটার দূরে। ১৯৬৯ সালের পূর্ব পর্যন্ত টাঙ্গাইল শহরকে মহাকুমা হিসেবে বিবেচনা করা হতো যা বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৬৯ সালের পহেলা ডিসেম্বর টাঙ্গাইলকে একটি আলাদা জেলা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। উনিশ শতকের শুরুর দিকে অত্র এলাকায় ঘোড়ার গাড়ি ছিল পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম যাকে স্থানীয়ভাবে টাঙ্গা বলা হত। স্থানীয় টাঙ্গা নাম থেকে টাঙ্গাইল শহরের নামটি এসেছে বলে মনে করা হয়। এই পোস্টে টাঙ্গাইল শহরের পর্যটন আকর্ষণগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো।

এস পি পার্ক

টাঙ্গাইলের প্রধান নদী লৌহজং সংলগ্ন পুলিশ লাইনস এর নিকটবর্তী খাল সংস্কার এবং খননের পর খালের দুই পাশে নির্মাণ করা হয়েছে আকর্ষণীয় এই পার্কের। মূলত এটি একটি বিনোদন কেন্দ্র ও সামাজিক পার্ক। শহরের মানুষেরা ব্যস্ত দিন শেষে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সুন্দর একটি বিকাল কাটাবার জন্য এবং পরিবারবর্গের বিনোদনের জন্য এখানে ভিড় জমান। পার্কের প্রধান স্থাপনা রয়েছে হাজরা ঘাট নামক এলাকায়। পার্কের সংরক্ষিত এলাকায় শুরু হয়েছে টাঙ্গাইল পুলিশ লাইন হাই স্কুল থেকে এবং এর শেষ প্রান্ত কারাগার পর্যন্ত বিস্তৃত।

এই পার্কের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য খালের দুই প্রান্তে সারি সারি ফুলের গাছ রোপণ করা হয়েছে; যা পার্কের সৌন্দর্যকে অন্য এক মাত্রায় নিয়ে যায়। পার্কে ভ্রমণকারীদের বিশ্রামের জন্য অভ্যন্তরস্থ বিভিন্ন স্থানে রয়েছে বসার জন্য বেঞ্চ। বসার স্থানগুলো আলাদা আলাদা হওয়ার কারণে সকলে তাদের প্রাইভেসি বজায় রেখে পরিবার সমেত বসতে পারেন। পার্কে ভ্রমণরত সকলের জন্য ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা রাখা হয়েছে।

পার্কে আগমনকারী শিশু-কিশোরদের জন্য বিভিন্ন ধরনের রাইড রয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে পার্কে মনমুগ্ধকর আলোকসজ্জা, তার শোভা ছড়াতে থাকে। বিভিন্ন গাছে জড়িয়ে থাকা আলোক বাতি অনেকটা ক্রিসমাস ট্রি’র মত দেখায়। অনেক বয়স্ক লোকজন এখানে প্রকৃতির নির্মল বাতাসে হালকা ব্যায়াম ও হাটা চলার জন্যও এসে থাকেন। সাধারণ টাঙ্গাইলবাসীর কাছে এবং ভ্রমণকারীদের জন্য এই পার্কটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের ও পেশার মানুষজনের পদচারণায় সমগ্র পার্কটি মুখরিত হয়ে থাকে। মূলত টাঙ্গাইল জেলা শহরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব আলম, এই এলাকার উন্নতিতে ব্যাপক অবদান রেখেছেন; যার জন্য টাঙ্গাইলবাসীরা তার কাছে কৃতজ্ঞ এবং তাঁর পদবি অনুযায়ী জনপ্রিয় এই পার্কের নামকরণ করা হয়েছে। এসপি পার্কটি টাঙ্গাইল শহরের একটি ল্যান্ডমার্ক। এজন্য শহরের যেকোনো স্থান থেকে খুব সহজেই এখানে আসা যায়।

করটিয়া জামে মসজিদ

টাঙ্গাইল জেলা শহরের করোটিয়া নামক ইউনিয়নে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এই মসজিদটি অবস্থিত। এই মসজিদ সম্পর্কে সবচাইতে পুরাতন যে তথ্য পাওয়া যায় তা আতিয়ার চাঁদ নামক গ্রন্থ থেকে সংকলিত। জানা যায় যে আফগান শাসক সোলায়মান খান এর ছেলে বায়েজিদ খান পন্নী, ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করেন। ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনকালে, বায়াজীদ খান পন্নীর পুত্র সাঈদ খান পন্নী এই মসজিদের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে পন্নী বংশের ১১তম পুরুষ সাদাত আলী খান পন্নী এখানকার মালিকানা নিয়ে মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েন।

তৎকালীন ঢাকার জমিদার খাজা আলিমুল্লাহ তাকে সার্বিক সহায়তা করেন কিন্তু শর্ত ভাঙ্গার কারণে সাদাত আলী খান পূর্বপুরুষের অধিকৃত সম্পত্তির ভোগ- স্বত্বের ডিক্রি লাভ করেন। অনন্যোপায় হয়ে সাদাত আলী খান তার স্ত্রী জমরুদুন্নেসা খানমের নামে দানপত্র দলিলে লিপিবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে পুনরায় উভয়পক্ষ মীমাংসা করতে রাজি হয়। মীমাংসা অনুযায়ী সাদাত আলী খান, জমিদার খাজা আলিমুল্লাহ কে তার সমস্ত সম্পত্তির ৭ আনা অংশ দিতে রাজি হন, আর বাকি নয় আনা সম্পদ তিনি ও তার স্ত্রী ভাগাভাগি করে নেন।

এই জমিদার বংশের ১৩ তম  জমিদার আতিয়ার চাঁদ দানবীর হিসেবে  এলাকায় পরিচিত ছিলেন। শুধু দানবীর হিসেবে নয়, তিনি খিলাফত আন্দোলন এবং অসহযোগ আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেন; যার জন্য ১৯২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিনি কারারুদ্ধ হন। তিনি ছিলেন দৃঢ় মানসিকতার ও ব্যক্তিত্বের প্রতীক। আন্দোলনসমূহে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লন্ডন মিউজিয়ামে ওয়াজেদ আলী খান তথা জমিদার আতিয়ার আলী চাঁদ এর  সম্মানার্থে  তৈলচিত্র অংকন ও সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে জমিদার আতিয়ার আলী চাঁদ এর তৈলচিত্রের নিচে লিখা আছে “ওয়ান হু ডিফাইড দ্যা ব্রিটিশ” অর্থাৎ এমন একজন মানুষ যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।

টাঙ্গাইলের জিরো পয়েন্ট থেকে ১০ কিলোমিটার দূরবর্তী পুঠিয়ার তীর সংলগ্ন এলাকায় আতিয়ার চাঁদ নির্মিত করটিয়া জমিদার বাড়ি অবস্থিত। এই জমিদার বাড়িটি আয়তনে বিশাল এবং নিরিবিলি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত। এই প্রাসাদের দৈর্ঘ্য প্রায় এক কিলোমিটার এবং প্রস্থ প্রায় আধা কিলোমিটার; যা সম্পূর্ণরূপে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।

ভবন সংলগ্ন আরও যেসব কক্ষসমূহ রয়েছে সেসব হলো রোকেয়া মহল, দাউদ মহল, লোহার ঘর, ছোট তরফ, রাণীর পুকুরঘাট, এবং বাড়িসংলগ্ন মোগল স্থাপত্যের আদলে গড়া মসজিদ যা একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য। এই জমিদার বাড়িটি  চৈনিক স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন নিয়ে গড়ে তোলা যা সকলের আগ্রহের একটি বিশেষ দিক। এটি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাতাত্ত্বিক ভবন হওয়ার পরেও, বর্তমান সময়ে এটিকে কোচিং সেন্টার ও বিদ্যালয় হিসেবে  ব্যবহার করা হয়েছে।

আতিয়া মসজিদ

টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্রে লৌহজং নদীর পূর্ব প্রান্তে আতিয়া মসজিদ অবস্থিত। মসজিদটির নির্মাণ করা হয়েছিল ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে। এটি মুঘল আমলের স্থাপত্য রীতির একটি নিদর্শন। মসজিদটির নির্মাণ কাল সম্পর্কে লিখিত ফলক উদ্ধার করা গেছে, যা এই মসজিদকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে পরিগণিত হবার যোগ্যতা দান করে।

মসজিদের স্থাপত্য উপাদানগুলো পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যায় যে, এটি মুঘল বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সাধারণ সুবিধাগুলোর একত্রীকরণ করে। যেমন মসজিদের পশ্চিম প্রান্তে বৃহদাকার একটি পানির ট্যাংকার রয়েছে যা সম্ভবত অজুর ব্যবস্থা করার জন্য নির্মিত হয়েছিল। মসজিদের প্রবেশপথে তিনটি খিলানযুক্ত ফটক রয়েছে। মসজিদের প্রার্থনা ঘরের উপরে তিনটি ছোট গম্বুজ রয়েছে।

তাছাড়াও মসজিদের দুই পাশে দুটি আলাদা প্রবেশ দুয়ার রয়েছে, যার মাধ্যমে সরাসরি প্রার্থনা কক্ষে প্রবেশ করা যায়। মসজিদের চার কোনার অংশে নকশাকৃত চারটি অষ্টভূজাকার টাওয়ার রয়েছে। টাওয়ারগুলোতে বিভিন্ন ধরনের নকশা ও অলংকরণ বিদ্যমান। এসব নকশা ঐতিহাসিক মর্যাদা বহন করে এবং অতীতকালের স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে নিখুঁত ধারণা দেয়। মসজিদের কোণঘেষা টাওয়ারগুলোর প্রত্যেকটির শেষ প্রান্তে একটি করে ছোট গম্বুজ রয়েছে। এই গম্বুজগুলোর প্রত্যেকটিই বিভিন্ন ধরনের শৈল্পিক অলঙ্করণে অলংকৃত।

কীভাবে যাবেন ও কোথায় থাকবেন

টাঙ্গাইল ঢাকার নিকটবর্তী হওয়ার কারণে, এখানে বিমানযোগে গমনের কোন রুট নেই। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল যাওয়ার সবচাইতে জনপ্রিয় মাধ্যমগুলো হচ্ছে বাস এবং ট্রেন। সাধারণ নন এসি বাসের ভাড়া মাত্র ১২০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া ২৫০ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে আপনি যদি ট্রেনের টিকেট কাটতে চান, সে ক্ষেত্রে আপনার জন্য বিভিন্ন রেঞ্জের টিকিট রয়েছে। যেমন, সাধারণ সিঙ্গেল টিকিটের ভাড়া ১৫৫ টাকা, ট্রেনের এসি টিকিটের ভাড়া ২১০ টাকা থেকে ২৪০ টাকার মধ্যে। আর আপনি যদি ট্রেনের এসি বার্থে টিকিট কাটতে চান, তাহলে আপনাকে ৩১৫ টাকা পর্যন্ত ভাড়া গুণতে হবে। এসব ছাড়াও আপনি প্রাইভেট কার বা ট্যাক্সি ক্যাব ভাড়া নিয়ে টাঙ্গাইল পৌঁছে যেতে পারেন।

টাঙ্গাইলে থাকার মতো বেশ কিছু গেস্ট হাউস এবং হোটেল রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আল ফয়সাল, হোটেল পলাশ হাউস, আফরিন হোটেল, হোটেল সাগর রেসিডেন্সিয়াল, এস এস রেস্ট হাউস, নিরালা হোটেল, সুগন্ধা হোটেল, এলজিইডি রেস্ট হাউস, পল্লী বিদ্যুৎ রেস্ট হাউস, ইত্যাদি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button